রাজস্ব বনাম জীবিকা

Date:

spot_img

আলী কদর পলাশ

ব্যাটারিচালিত রিকশাকে করজালে আনার চিন্তা রাজস্ব আদায়ের দৃষ্টিতে স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পেছনে শুধু কর নয়, আরও বড় প্রশ্ন আছে। সড়ক ব্যবস্থাপনা, নিবন্ধন, নিরাপত্তা, জীবিকা এবং নগর শৃঙ্খলা। এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর না দিয়ে কেবল অগ্রিম আয়কর বসালে সমস্যার সমাধান হবে না, বরং নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে।

দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা ৫০ লাখের বেশি বলে খাত সংশ্লিষ্টদের ধারণা। ঢাকাতেই চলাচল করছে ১০ থেকে ১২ লাখ। এত বড় একটি খাত দীর্ঘদিন ধরে প্রায় অনিয়ন্ত্রিত। নিবন্ধন নেই, সঠিক পরিসংখ্যান নেই, ফিটনেস যাচাই নেই, চালকদের প্রশিক্ষণ নেই। অথচ এই বাহনের সঙ্গে যুক্ত লাখ লাখ মানুষের জীবিকা। তাই এই খাতকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা জরুরি। কিন্তু কর আরোপের আগে সরকারকে জানতে হবে, কোন এলাকায় কত রিকশা চলবে, কোন সড়কে চলবে, কী ধরনের যান নিরাপদ, ব্যাটারি ও চার্জিং ব্যবস্থার মান কী হবে।

প্রস্তাব অনুযায়ী সিটি করপোরেশন এলাকায় বছরে ৫ হাজার, পৌরসভায় ২ হাজার এবং ইউনিয়নে ১ হাজার টাকা কর নেওয়া হতে পারে। দরিদ্র চালক বা ক্ষুদ্র মালিকের জন্য এই অঙ্ক ছোট নয়। অনেক ক্ষেত্রে রিকশার প্রকৃত মালিক আলাদা, চালক আলাদা। করের চাপ শেষ পর্যন্ত চালকের দৈনিক জমা বা ভাড়ার ওপর পড়তে পারে। ফলে যাদের আয় সবচেয়ে অনিশ্চিত, তারাই বেশি চাপে পড়বে। করনীতি তাই শুধু রাজস্বের হিসাব দিয়ে নয়, সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় করে নিতে হবে।

মোটরসাইকেলের ওপর সিসিভেদে অগ্রিম আয়কর আরোপের ভাবনাও এসেছে। ১১০ সিসি পর্যন্ত ছাড়, এরপর ২ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত করের প্রস্তাব আছে। মোটরসাইকেল এখন ব্যক্তিগত চলাচলের পাশাপাশি বাণিজ্যিক কাজেও ব্যবহৃত হয়। ফলে যুক্তিসঙ্গত কর কাঠামো থাকতে পারে। তবে নিবন্ধন ফি, রোড ট্যাক্স ও অন্যান্য ব্যয়ের সঙ্গে নতুন কর যোগ হলে মধ্যবিত্তের ওপর চাপ কতটা বাড়বে, সেটিও হিসাব করা দরকার।

সরকারের রাজস্ব দরকার, এ নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু সহজ লক্ষ্য বেছে নিয়ে কর বসানো টেকসই সমাধান নয়। ব্যাটারিচালিত রিকশা আগে নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে। চালক ও মালিকের প্রকৃত তথ্যভান্ডার তৈরি করতে হবে। সড়কভেদে চলাচলের নিয়ম করতে হবে। দুর্ঘটনা কমাতে ফিটনেস, গতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। তারপর ধাপে ধাপে যৌক্তিক কর আরোপ করা যেতে পারে।

করজাল বাড়ুক, তবে তা যেন দুর্বল মানুষের গলায় ফাঁস না হয়। ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণের দরকার আছে। কিন্তু নিয়ন্ত্রণের নামে শুধু রাজস্ব আদায়ের পথ খোলা হলে নগরও বাঁচবে না, শ্রমজীবী মানুষও স্বস্তি পাবে না। সরকারের উচিত হবে করের আগে শৃঙ্খলা, রাজস্বের আগে নীতি, আর সিদ্ধান্তের আগে বাস্তবতার পূর্ণ হিসাব নেওয়া।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

বাচসাসের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে ভোট ২০ নভেম্বর

এম.আর.জে শান্ত: বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির (বাচসাস) ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের...

কমিশনার মামুনের পিতার মৃত্যুতে দোয়া মাহফিল

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর ও বংশাল থানা...

আগামী তিন বছরে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে: ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার

বাগেরহাট প্রতিনিধি আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশে এক লাখ নতুন...

খুলনায় ফুটপাত দখলমুক্ত করতে কেসিসির অভিযান, ভাঙা হলো অবৈধ দোকানপাট

খুলনা প্রতিনিধি খুলনা নগরীর ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ...