তৃতীয় ভবিষ্যদ্বাণী মিললেই ‘ধ্বংস’ যুক্তরাষ্ট্র!

Date:

spot_img

আলী কদর পলাশ

তৃতীয় ভবিষ্যদ্বাণী মিললেই ‘ধ্বংস’ যুক্তরাষ্ট্র!” আমাদের দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি সংবাদপত্রের এই শিরোনামটি স্বাভাবিকভাবেই পাঠকের কৌতূহল জাগায়। কারণ এতে আছে এক ধরনের চূড়ান্ত ভবিষ্যতের ইঙ্গিত। যেন বিশ্বরাজনীতির একটি বড় পরিণতি ইতিমধ্যে লেখা হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক রাজনীতির মতো জটিল বাস্তবতায় এমন নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী কতটা বিশ্বাসযোগ্য।

গতকাল ৯ মার্চ পত্রিকাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের এক অধ্যাপক নাকি দুই বছর আগেই তিনটি পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। প্রথমত, ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফিরবেন। দ্বিতীয়ত, তার আমলে ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরু হবে। তৃতীয়ত, সেই সংঘাতে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় ঘটবে এবং রাষ্ট্রটি ধ্বংসের দিকে যাবে। এই বক্তব্যের দুটি অংশ আংশিকভাবে বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এখানেই সাংবাদিকতার মৌলিক প্রশ্নটি উঠে আসে।

দুটি ঘটনার সঙ্গে কোনো পূর্বের মন্তব্য মিললেই কি তৃতীয় ঘটনাও নিশ্চিত হয়ে যায়?

মধ্যপ্রাচ্যে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা অবশ্যই বাস্তব। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে এবং এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে। যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি পরিবহন হয়। এই অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে বৈশ্বিক সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগতে পারে বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন।

অর্থাৎ বাস্তব সংকট আছে। কিন্তু সেই সংকটকে “ধ্বংসের ভবিষ্যদ্বাণী” দিয়ে ব্যাখ্যা করা ভিন্ন বিষয়।

যে চীনা অধ্যাপকের কথা বলা হচ্ছে, তিনি মূলত ইতিহাসভিত্তিক বিশ্লেষণ করেন। তিনি “Predictive History” নামে একটি ধারণা ব্যবহার করে ইতিহাসের প্রবণতা থেকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন। অনেক বিশ্লেষকই এ ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করেন। কিন্তু সেটিকে নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে গ্রহণ করা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নয়।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি সব সময় বহু ভেরিয়েবলের ওপর নির্ভর করে। সামরিক শক্তি, অর্থনীতি, কূটনীতি, আঞ্চলিক জোট, এমনকি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে একটি বক্তৃতা বা তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দিয়ে কোনো রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ আছে যেখানে বড় শক্তিগুলোর পতনের ভবিষ্যদ্বাণী আগেভাগে করা হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন পথে গেছে। আবার কখনও বড় পরিবর্তন এমনভাবে এসেছে, যা কেউ আগেভাগে কল্পনাও করেনি। ফলে ইতিহাসের বাস্তবতা সব সময় ভবিষ্যদ্বাণীর চেয়ে বেশি জটিল।

এখানেই গণমাধ্যমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সংবাদপত্র শুধু তথ্য দেয় না, সেই তথ্যের ভাষা দিয়েই পাঠকের ধারণা তৈরি হয়। যখন শিরোনামে “ধ্বংস” বা “শেষ” ধরনের চূড়ান্ত শব্দ ব্যবহার করা হয়, তখন পাঠকের মনে একটি নিশ্চিত ফলাফলের ধারণা তৈরি হয়। অথচ বাস্তবে সেটি হয়তো কেবল একটি মতামত বা অনুমান।

আন্তর্জাতিক বড় সংবাদমাধ্যমগুলো সাধারণত এ কারণে আরও সংযত ভাষা ব্যবহার করে। তারা সংঘাতকে ব্যাখ্যা করে “উত্তেজনা বৃদ্ধি”, “সংঘাত বিস্তার”, “জ্বালানি বাজারে চাপ” বা “ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি” শব্দে। কারণ এই ভাষা বাস্তব পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করে, কিন্তু ভবিষ্যৎকে নিশ্চিত ধরে নেয় না।

সংবাদপত্রের শক্তি এখানেই। নাটকীয়তা তৈরি করা সহজ। কিন্তু তথ্যকে প্রেক্ষাপটে রেখে ব্যাখ্যা করা কঠিন। তবু সেই কঠিন কাজটাই সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট অবশ্যই গুরুতর। এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি থেকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। কিন্তু এই বাস্তব সংকটকে যদি রহস্যময় ভবিষ্যদ্বাণীর গল্পে পরিণত করা হয়, তাহলে পাঠক তথ্যের বদলে আতঙ্ক পান।

কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ভবিষ্যদ্বাণী দিয়ে লেখা হয় না। ইতিহাস লেখা হয় বাস্তব ঘটনা, সিদ্ধান্ত এবং শক্তির সমীকরণ দিয়ে। আর সেই ইতিহাসের প্রথম খসড়া লেখে সংবাদমাধ্যম। তাই শিরোনামের নাটকের বাইরে বাস্তব বিশ্লেষণই শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

বাচসাসের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে ভোট ২০ নভেম্বর

এম.আর.জে শান্ত: বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির (বাচসাস) ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের...

কমিশনার মামুনের পিতার মৃত্যুতে দোয়া মাহফিল

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর ও বংশাল থানা...

আগামী তিন বছরে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে: ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার

বাগেরহাট প্রতিনিধি আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশে এক লাখ নতুন...

খুলনায় ফুটপাত দখলমুক্ত করতে কেসিসির অভিযান, ভাঙা হলো অবৈধ দোকানপাট

খুলনা প্রতিনিধি খুলনা নগরীর ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ...