
বাগেরহাট প্রতিনিধি
একসময় ছিল পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ। সময়ের পরিক্রমায় সেই চিত্র বদলে গেছে। কোথাও কবরের ওপর জন্মেছে ঘন আগাছা, কোথাও গড়ে উঠেছে জঙ্গল। এর মধ্যে তীব্র হয়েছে জায়গার সংকট। ফলে নতুন মরদেহ দাফন থেকে শুরু করে স্বজনদের কবর জিয়ারত—সব ক্ষেত্রেই ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে মানুষকে। বাগেরহাট শহরের সরুই এলাকার ঐতিহ্যবাহী বড় কবরস্থানের বর্তমান চিত্র এটি।
প্রায় চার বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই কবরস্থানে ১৯৫৯ সাল থেকে মরদেহ দাফন করা হচ্ছে। দীর্ঘ ৬৭ বছরে এখানে প্রায় এক লাখ মরদেহ দাফন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। ধনী-গরিব, অসহায়, দুস্থ কিংবা বেওয়ারিশ—সবার শেষ আশ্রয়স্থল এই কবরস্থানটি এখন অপর্যাপ্ত পরিচর্যা, জনবল সংকট ও জায়গার অভাবে নানা সমস্যায় জর্জরিত।
স্থানীয়দের ভাষ্য, যাদের নিজস্ব জমি বা পারিবারিক কবরস্থানের ব্যবস্থা নেই, তাদের অনেকের শেষ আশ্রয় এই কবরস্থান। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহারের ফলে দাফনের জন্য নতুন জায়গা পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে নিয়মিত পরিচর্যার অভাবে কবরস্থানের বিস্তীর্ণ অংশ আগাছা ও জঙ্গলে ঢেকে গেছে।
কবরস্থানে দোয়া করতে আসা মজিদ শেখ বলেন, এখানে তাঁর দাদি ও সন্তানের কবর রয়েছে। প্রতিদিন আসরের নামাজের পর তিনি কবর জিয়ারত ও দোয়া-দরুদ করতে আসেন। পরিবেশ মোটামুটি ভালো থাকলেও কবরস্থানটি আরও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা গেলে স্বজনদের নিয়ে আসা মানুষের ভালো লাগবে।
স্থানীয় বাসিন্দা রাসেল শেখ বলেন, বড় কবরস্থানটি বাগেরহাট শহরের মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন অনেক মানুষ স্বজনদের কবর জিয়ারত করতে আসেন। কিন্তু আগাছা-জঙ্গল ও জায়গার সংকটের কারণে তাঁদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। কবরস্থানটি নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, পর্যাপ্ত লোকবল নিয়োগ এবং জায়গার সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
মোল্লাহাট থেকে তাবলিগ জামাতে আসা শাফিন আহমেদ বলেন, প্রায় ১৫ বছর আগে এখানে এসে কবরস্থানটি দেখেছিলেন। তখন পুরো এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর ছিল। দীর্ঘদিন পর আবার এসে অনেক জায়গায় আগাছা-জঙ্গল দেখে কষ্ট পেয়েছেন। শহরের প্রধান কবরস্থান হিসেবে এটি নিয়মিত পরিষ্কার রাখা এবং আগের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
সালাম শেখ বলেন, আগে কবরস্থানটির পরিচ্ছন্নতা দেখে ভালো লেগেছিল। কিন্তু এবার তাবলিগ জামাতের জোড়ে এসে অনেক জায়গা আগাছায় ভরে থাকতে দেখেছেন। জায়গার সংকট ও পরিচর্যার অভাবে কবরস্থানটির স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। তাই পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনে জায়গা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
কবরস্থানের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা মোঃ দেলোয়ার হোসেন বলেন, তিনি ২০০৪ সাল থেকে এখানে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৫৯ সাল থেকে কবরস্থানটিতে মরদেহ দাফন করা হচ্ছে। আগে দাফন করা মরদেহের তথ্য নিয়মিত লিখে রাখা হতো না। ২০১১-১২ সালের দিকে তথ্য সংরক্ষণ শুরু হয়।
তিনি বলেন, প্রায় চার বিঘা জমির এই কবরস্থানে বর্তমানে জায়গার সংকট রয়েছে। বর্ষাকালে আগাছা দ্রুত বেড়ে যায়। কিন্তু মাত্র দুজন দায়িত্ব পালন করায় পুরো এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। একদিকে পরিষ্কার করতে গেলে অন্যদিকে আবার আগাছা জন্মায়। মাঝেমধ্যে পৌরসভা থেকেও পরিচ্ছন্নতার কাজ করা হয়। তবে লোকবল কম থাকায় পুরো কবরস্থান পরিষ্কার রাখা সম্ভব হয় না।
কবরস্থানে আগে কাজ করেছেন মোঃ ইমরান বলেন, তাঁর বাবা এখানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ বছর চাকরি করেছেন। বাবার সঙ্গে তিনিও কাজ করেছেন। সে সময় কবরস্থানটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ছিল। বর্তমানে কেন এমন অবস্থা হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারবেন না। তবে নিজের বাড়ির পাশে অবস্থিত কবরস্থানের বর্তমান অবস্থা দেখে তাঁরও খারাপ লাগে। কারণ প্রতিটি মানুষের শেষ ঠিকানা এই মাটি। তাই কবরস্থানটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা সবার দায়িত্ব।
এদিকে বড় কবরস্থানে বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন ও অসহায় মানুষের সেবায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন মোঃ জয়নাল আবেদীন। তিনি বলেন, ১৯৭৪ সালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ কাজ শুরু করেন। পরে ১৯৯৫ সালে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম বাগেরহাটে কার্যক্রম শুরু করার পরও সেবামূলক কাজ অব্যাহত রয়েছে। জয়নাল আবেদীনের দাবি, এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন এবং প্রায় দুই হাজার দুস্থ মানুষকে সহায়তা করেছেন তিনি। অধিকাংশ কাজ নিজের অর্থে করতে হয়। সরকারি সহায়তাও সীমিত।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতেও যেন মানবসেবার কাজ বন্ধ না হয়, সে জন্য একটি স্থায়ী অফিস, উপযুক্ত জায়গা ও ঘর নির্মাণ প্রয়োজন। বর্তমান স্থাপনাটি সংস্কার এবং জায়গাটিকে সেবামূলক কাজের উপযোগী করে তোলাও জরুরি। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও পৌর প্রশাসক মোজবাহ উদ্দিন বলেন, বড় কবরস্থানটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান। এখানকার জায়গার সংকট, পরিচ্ছন্নতা ও অবকাঠামোগত সমস্যার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। কবরস্থানটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও মর্যাদাপূর্ণ রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি জায়গার সংকট নিরসন ও বেওয়ারিশ মরদেহ দাফনসহ মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শহরের গুরুত্বপূর্ণ এই কবরস্থানের জায়গার সংকট নিরসন, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা ও প্রয়োজনীয় সংস্কারে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে কবরস্থানের জায়গা সম্প্রসারণ, আগাছা পরিষ্কারে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ এবং দীর্ঘদিনের দাফনের তথ্য সংরক্ষণে পরিকল্পিত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
অসংখ্য মানুষের শেষ ঠিকানা এই কবরস্থান শুধু দাফনের স্থান নয়, স্বজনদের স্মৃতি ও আবেগেরও অংশ। তাই এর পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ ও মর্যাদা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সমাজের সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা জরুরি।





