
আলী কদর পলাশ
আজ রাতে নরওয়ে থেকে নানাভাই তুরানের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা হলো।
ভিডিও কলের ওপারে বসে সে একের পর এক ছবি দেখাচ্ছে। প্রথমে নেইমারের ছবি। নিজের হাতে এঁকেছে। তারপর একটি বিড়ালের ছবি। সেটিও তার আঁকা। এরপর দেখাল ম্যাকডোনাল্ডসে তার প্রিয় বার্গার খাওয়ার ছবি।
আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছি।

আরও মজার ব্যাপার হলো, ভিডিও কলে যে এভাবে ছবি দেখানো যায়, সেটাই আমার জানা ছিল না। এখনো জানা নেই। তুরান একের পর এক ছবি দেখাচ্ছে। কখনো ছবিটি পর্দার পেছনে, কখনো অন্যভাবে। অথচ আমি তাকে দেখতে পাচ্ছি, তার সঙ্গে কথাও বলছি।
নতুন প্রযুক্তির এই ছোট্ট কৌশলটি আমার নাতি জানে। আমি জানি না।
ভাবছিলাম, পৃথিবীটা কত দ্রুত বদলে যাচ্ছে! একদিন যে শিশুকে আমরা হাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছি, আজ সে আমাদের নতুন পৃথিবীর পথ দেখাচ্ছে।
কিন্তু আজকের কথোপকথনে সবচেয়ে বড় বিস্ময়টি অপেক্ষা করছিল অন্য জায়গায়।
হঠাৎ তুরান বলল,
‘নানা, তুমি তো সাহস দিয়ে আমাদের নরওয়ে পাঠালে। আমি তো মনে করতাম তুমি খুব সাহসী।’
আমি শুনছি।
সে আবার বলল,
‘অথচ তুমি একটা দাঁত তোলার জন্য একবার আমাকে ফোন করছ, একবার মাকে ফোন করছ, একবার মামাকে ফোন করছ, একবার বাবাকে ফোন করছ। কী করতে হবে, সবার কাছে জানতে চাইছ!’
আমি হেসে ফেললাম।
কথা তো মিথ্যা নয়।
সত্যিই একটি দাঁত তোলার বিষয় নিয়ে গত কয়েক দিন আমি কতজনের সঙ্গে যে কথা বলেছি! চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে কত প্রশ্ন, কত দুশ্চিন্তার!
তুরান কিন্তু এখানেই থামল না।
এবার একটু গোপন কথা বলার ভঙ্গিতে বলল,
‘সত্যি নানা, চুপিচুপি বলছি। মা অনেক আগেই বলেছে, বুবুও বলেছে, নানা সবচেয়ে ভীতু মানুষ। একা একা কাঁদে।’
কথাটা শুনে প্রথমে খুব হাসলাম।
তারপর কী আশ্চর্য, হাসির মধ্যেই বুকের কোথায় যেন একটু ব্যথা লাগল।
একটি নয় বছরের শিশু কত সহজে মানুষের ভেতরের মানুষটিকে চিনে ফেলে!
সারা জীবন কত কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়েছি। কত ঝড় এসেছে। কতবার মনে হয়েছে, এবার বুঝি আর পারব না। তবু দাঁড়িয়ে থেকেছি। নিজের মতো করে লড়েছি।
অথচ সামান্য একটি দাঁত তোলার কথা শুনেই ভয় পেয়েছি।
তুরানের কাছে বিষয়টি বড় অদ্ভুত।
যে নানা তাকে আর তার পরিবারকে এত দূরের দেশে যাওয়ার সাহস দিয়েছে, সেই নানা নিজেই কেন এত ভয় পায়?
আমি তাকে কী করে বোঝাই, নানাভাই, সাহসী মানুষেরও ভয় থাকে।
সাহস মানে ভয় না পাওয়া নয়। ভয় নিয়েও কখনো কখনো সামনে এগিয়ে যাওয়া।
আর বয়স বাড়লে মানুষ হয়তো একটু অন্য রকম হয়ে যায়। জীবনের বড় বড় বিপদ পেরিয়ে আসা মানুষটিও ছোট্ট একটি কষ্টের সামনে অসহায় বোধ করতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, নিজের মানুষগুলোর কাছে ভয় প্রকাশ করতে লজ্জা লাগে না।
তুরানকে আমি এসব বলিনি।
তার সঙ্গে হেসেছি। মজা করেছি।
কিন্তু ফোন রাখার পর অনেকক্ষণ কথাগুলো মনে পড়ছিল।
‘নানা সবচেয়ে ভীতু মানুষ। একা একা কাঁদে।’
শিশুর মুখে কথাটি শুনে মনে হলো, আমাদের বড়দের সাজিয়ে রাখা সাহসের মুখোশটি কত সহজেই খুলে যায়।
আমরা চাই, ছোটরা আমাদের শক্ত মানুষ হিসেবে দেখুক। মনে করুক, নানা সব পারে। বাবা সব জানে। মা সব সামলে নিতে পারে।
কিন্তু শিশুরা একদিন আবিষ্কার করে, বড়রাও ভয় পায়। বড়রাও কষ্ট পায়। কখনো কখনো তারাও একা একা কাঁদে।
এই আবিষ্কারটি হয়তো বড় হয়ে ওঠারই একটি অংশ।
আজ তুরান আমাকে নিয়ে হাসল। আমার ভয় নিয়ে মজা করল। আমার গোপন দুর্বলতার খবরও জানিয়ে দিল।
অথচ এই শিশুটিই এখন আমার সাহসের একটি বড় উৎস।
হাজার হাজার মাইল দূরে বসে সে যখন নিজের আঁকা ছবি দেখায়, নতুন ভাষায় কথা বলে, নতুন বন্ধুদের গল্প শোনায়, তখন আমার বুকটা ভরে ওঠে।
মনে হয়, তাকে এত দূরে যেতে উৎসাহ দিয়েছিলাম বলেই তো আজ তার পৃথিবীটা এত বড় হচ্ছে।
তবু সত্যি কথা বলতে কী, এই দূরত্বেরও একটা কষ্ট আছে।
ভিডিও কলে তাকে দেখি। কথা শুনি। হাসি দেখি। দুষ্টুমি দেখি।
শুধু কাছে টেনে নিতে পারি না।
মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে পারি না।
হয়তো এই না পারার কষ্টটুকুই কখনো কখনো চোখের জল হয়ে আসে।
তুরান, তুমি আজ আমাকে ভীতু বলেছ।
আমি প্রতিবাদ করিনি।
কারণ তোমার কথার মধ্যে কিছুটা সত্যি আছে।
আমি ভয় পাই। তোমাদের জন্য ভয় পাই। তোমাদের দূরে থাকার কথা ভাবলে মন খারাপ হয়। কখনো কখনো নিজের অসহায়ত্বও টের পাই।
কিন্তু জানো নানাভাই, তোমাদের স্বপ্নের পথে এগিয়ে যেতে দেখলে সেই ভয়টুকু কোথায় যেন হারিয়ে যায়।
আজ তুমি নেইমারের ছবি আঁকছ। বিড়ালের ছবি আঁকছ। মাকে নরওয়েজীয় ভাষা শেখাচ্ছ। আবার তোমার নানার ভয় নিয়েও হাসতে পারছ।
এই হাসিটুকু যেন কখনো হারিয়ে না যায়।
তুমি বড় হও। সাহসী হও। মানুষের কষ্ট বুঝতে শেখো।
আর কখনো যদি দেখো, তোমার খুব সাহসী বলে মনে হওয়া কোনো মানুষ চুপিচুপি কাঁদছে, তাকে ভীতু ভেবো না।
হয়তো তার বুকের ভেতর অনেক ভালোবাসা জমে আছে।
সব ভালোবাসা তো হাসি হয়ে বেরোয় না।
কিছু ভালোবাসা চোখের জল হয়েও ঝরে।
আজ রাতে তোমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে সেই কথাটিই আবার বুঝলাম।
নানাভাই, তোমাকে দূরে পাঠানোর সাহস আমার ছিল।
কিন্তু তোমাকে দূরে রেখে থাকার সাহসটা এখনো শিখছি।
১৮ অক্টোবর, ২০২৬
ছবি: আমার মেয়ের সঙ্গে নাতি।
নানাভাইয়ের চোখে
নাতির নরওয়ে ডায়েরি, হৃদয়ে বাংলাদেশ
যে নামে আমি যখন যা মন চায় লিখি…





