
আলী কদর পলাশ
১৭ অক্টোবর ফকির লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস। ১৮৯০ সালের এই দিনে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে। একশ ছত্রিশ বছর পরও তাঁর গান আমাদের মুখে, তাঁর নাম উৎসবে, তাঁর দর্শন নিয়ে আলোচনা হয়। অথচ যে সমাজে তিনি মানুষকে পরিচয়ের খাঁচা ভেঙে দেখতে শিখিয়েছিলেন, সেই সমাজেই আমরা নতুন নতুন খাঁচা বানাচ্ছি। ধর্মের খাঁচা, দলের খাঁচা, মতের খাঁচা, শ্রেণির খাঁচা, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেরও খাঁচা। তাই লালনের তিরোধান দিবসে শুধু তাঁকে স্মরণ করলেই হয় না। নিজেদেরও প্রশ্ন করা দরকার, লালনের দেশে এত বিভাজন কেন?

লালনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর প্রশ্ন করার সাহস। তিনি কোনো প্রতিষ্ঠানের ভাষায় কথা বলেননি, কোনো ক্ষমতার ভাষায়ও নয়। তিনি মানুষের দিকে তাকিয়েছিলেন মানুষের চোখে। তাঁর কাছে জাত, বর্ণ, ধর্ম কিংবা সামাজিক পরিচয় মানুষের চেয়ে বড় হয়ে উঠতে পারেনি। “সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে” তাই শুধু একটি গানের পঙক্তি নয়, আমাদের সমাজের গভীরে ছুড়ে দেওয়া এক আয়না। আমরা আজও সেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। শুধু সময় পাল্টেছে, বিভেদের ভাষা পাল্টেছে।
আমরা মুখে সহনশীলতার কথা বলি, কিন্তু ভিন্নমত শুনতে চাই না। ধর্মীয় পরিচয়ে মানুষকে বিচার করি, রাজনৈতিক পরিচয়ে সম্পর্ক মাপি, সামাজিক অবস্থান দিয়ে মর্যাদা নির্ধারণ করি। কে কোন পক্ষের, কে কোন বিশ্বাসের, কে কোন মতের, এই হিসাব করতে করতে মানুষটিকেই ভুলে যাই। যুক্তির বদলে তকমা, কথোপকথনের বদলে আক্রমণ, মতবিরোধের বদলে শত্রুতা আমাদের জনপরিসরকে সংকীর্ণ করে তুলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করেছে। একটি বাক্যের জন্য একজন মানুষকে পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়া হয়। ভুল সংশোধনের সুযোগ নেই, মত বদলের সুযোগ নেই, বোঝাপড়ার জায়গাও ক্রমে ছোট হচ্ছে।
লালনের দর্শন এই জায়গাতেই আজ সবচেয়ে জরুরি। তিনি মানুষকে এক রঙে রাঙাতে চাননি। বহুত্বের ভেতরে মানুষের মৌলিক একতাকে খুঁজেছেন। তাঁর গান ধর্মকে অস্বীকারের গান নয়, ধর্মের নামে অহংকার ও বিভাজনকে প্রশ্ন করার গান। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, মানুষের কাছে যাওয়ার পথ যদি দেয়াল দিয়ে বন্ধ করি, তবে সাধনার অর্থ কোথায়? এই প্রশ্ন এখনো অস্বস্তিকর। কারণ আমরা অনেকেই ধর্মকে হৃদয়ের আলোর বদলে পরিচয়ের পতাকা বানাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।
বাংলার ইতিহাসে ধর্মীয় সহাবস্থান, লোকায়ত সংস্কৃতি, সুফি ও বৈষ্ণব ভাবধারা, বাউল দর্শন এবং গ্রামীণ মানবিকতার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। লালন সেই ধারার সবচেয়ে উজ্জ্বল কণ্ঠগুলোর একটি। অথচ আজ এমন এক সময়, যখন ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে সন্দেহ, অবিশ্বাস ও উত্তেজনা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একটি গুজব, একটি বিকৃত ছবি, একটি উসকানিমূলক পোস্ট মুহূর্তে বহু মানুষের বিবেচনাকে আচ্ছন্ন করতে পারে। তখন প্রতিবেশী প্রতিবেশীকে আর প্রতিবেশী হিসেবে দেখে না, দেখে একটি পরিচয়ের প্রতিনিধি হিসেবে। এই মানসিকতাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
রাজনীতির ক্ষেত্রেও অসহিষ্ণুতা কম নয়। গণতন্ত্রের প্রাণ হলো মতের পার্থক্য, কিন্তু আমরা প্রায়ই মতের পার্থক্যকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখি। প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা যায়, কিন্তু তাকে নিশ্চিহ্ন করার বাসনা গণতান্ত্রিক নয়। ক্ষমতায় থাকা আর সত্যের মালিক হওয়া এক কথা নয়। বিরোধিতা করা আর শত্রু হওয়াও এক নয়। লালন রাজনীতির ভাষ্যকার ছিলেন না, কিন্তু তাঁর মানবদর্শন রাজনৈতিক সমাজকেও একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়। মানুষকে পরিচয়ের আগে মানুষ হিসেবে না দেখলে কোনো গণতন্ত্রই গভীর হতে পারে না।
শ্রেণিবিভাজনও আমাদের সমাজকে কম ক্ষতবিক্ষত করে না। আমরা একদিকে লালনের গান শুনে মুগ্ধ হই, অন্যদিকে শ্রমজীবী মানুষ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, ভিন্ন পেশার মানুষ কিংবা সামাজিকভাবে দুর্বল কাউকে অদৃশ্য করে রাখি। লালনের মানবতাবাদ শুধু ধর্মীয় সম্প্রীতির কথা বলে না; তা সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নও তোলে। মানুষের মূল্য তার পোশাকে, পদে, সম্পদে বা বংশে নয়। এই সহজ সত্য ভুলে গেলে সভ্যতার বাহ্যিক চাকচিক্য ভেতরের শূন্যতাকে ঢাকতে পারে না।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক হলো, আমরা লালনকে সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত করেছি, কিন্তু তাঁর প্রশ্নগুলোকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রেখেছি। মেলা করি, গান গাই, মঞ্চ সাজাই, গবেষণা করি। এগুলো অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু লালনের স্মরণ যদি কেবল উৎসবে সীমিত থাকে, তবে তাঁর দর্শনের সবচেয়ে জরুরি অংশটি হারিয়ে যায়। তিনি কোনো প্রস্তুত উত্তর দিয়ে যাননি; বরং প্রশ্ন রেখে গেছেন। সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড়ানোর সাহসই তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।
আজকের বাংলাদেশে লালনকে নতুন করে পড়ার অর্থ অতীতে ফিরে যাওয়া নয়। বরং বর্তমানকে বুঝতে তাঁর চোখ ধার করা। আমাদের সন্তানদের শেখাতে হবে, ভিন্ন বিশ্বাস মানেই ভয় নয়, ভিন্ন মত মানেই শত্রু নয়, ভিন্ন জীবনযাপন মানেই অধম নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংগঠন এবং গণমাধ্যম সবাইকে এই দায়িত্ব নিতে হবে। সহিষ্ণুতা মানে নিজের বিশ্বাস ছেড়ে দেওয়া নয়; নিজের বিশ্বাসে স্থির থেকেও অন্যের মানবিক মর্যাদাকে স্বীকার করা।
রাষ্ট্রের দায়িত্বও কম নয়। আইনের চোখে প্রত্যেক নাগরিকের সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ধর্মীয় ও সামাজিক সংখ্যালঘুদের ভয়মুক্ত রাখা, ঘৃণামূলক উসকানি ও সহিংসতার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়া, আবার একই সঙ্গে মতপ্রকাশের বৈধ পরিসর রক্ষা করা জরুরি। কারণ ভয় কখনো সম্প্রীতি তৈরি করে না। সম্প্রীতি তৈরি হয় ন্যায়বিচার, আস্থা এবং পারস্পরিক সম্মান থেকে।
লালনের দেশে বিভাজনের এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সরকার, রাজনীতি কিংবা ধর্মীয় নেতাদের কাছে নেই। উত্তর আমাদের প্রতিদিনের আচরণেও। আমরা ভিন্নমতের বন্ধুর সঙ্গে কীভাবে কথা বলি, অন্য ধর্মের প্রতিবেশীর উৎসবে কীভাবে দাঁড়াই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত কাউকে কী ভাষায় সম্বোধন করি, দুর্বল মানুষের প্রতি কতটা সম্মান দেখাই, সেখানেই আমাদের সহিষ্ণুতার পরীক্ষা।
একশ ছত্রিশ বছর আগে লালন চলে গেছেন। আমরা প্রযুক্তিতে এগিয়েছি, শহর বড় হয়েছে, শিক্ষা বিস্তৃত হয়েছে, পৃথিবী হাতের মুঠোয় এসেছে। কিন্তু মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার কাজটি এখনো অসম্পূর্ণ। এই অসম্পূর্ণতাই আমাদের বড় ব্যর্থতা।
তিরোধান দিবসে লালনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ফুলের চেয়ে বড় প্রয়োজন নিজের ভেতরের দেয়ালগুলো চিনে নেওয়া। ধর্ম থাকুক, মত থাকুক, দল থাকুক, পরিচয় থাকুক। কিন্তু সবকিছুর ওপরে মানুষটি যেন হারিয়ে না যায়। কারণ লালনের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা সেখানেই, মানুষের চেয়ে বড় কোনো পরিচয় নেই।
লালনের দেশে এত বিভাজন কেন, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে শেষ পর্যন্ত আমাদের নিজেদের কাছেই ফিরতে হয়। আমরা কি সত্যিই মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শিখেছি? যদি না শিখে থাকি, তবে লালনের গান যতই গাই, তাঁর দেশ এখনো তাঁর হয়ে ওঠেনি।

লেখক: প্রধান সম্পাদক





