
আলী কদর পলাশ
পৃথিবী যত আধুনিক হয়েছে, অর্থের চেহারা তত বদলেছে। একসময় সম্পদ মানে ছিল ধানভরা গোলা, জমি, রুপার মুদ্রা কিংবা সিন্দুকে রাখা সোনা। তারপর এল কাগজের নোট, ব্যাংকের হিসাব, কার্ড, ডিজিটাল লেনদেন। এখন বিপুল অর্থের কোনো দৃশ্যমান শরীরই নেই। কম্পিউটারের পর্দায় কয়েকটি সংখ্যা বদলালেই কোটি কোটি ডলার এক দেশ থেকে অন্য দেশে চলে যায়। অথচ পৃথিবী যখন ভয় পায়, মানুষ আবার ফিরে তাকায় সেই প্রাচীন ধাতুটির দিকে। হাজার বছরের ইতিহাস পেরিয়েও স্বর্ণ যেন এখনো বলে, আমাকে ছুঁয়ে দেখা যায়।
আজ সেই স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স চার হাজার একশ ডলারের ওপরে। ৫ অক্টোবর রয়টার্সের হিসাবে স্পট গোল্ড ছিল প্রায় ৪ হাজার ১৩২ ডলার। শক্তিশালী ডলার সেদিন দাম সামান্য নামালেও স্বর্ণ চার হাজার ডলারের ওপরে দৃঢ় ছিল। অর্থাৎ বাজারের চোখে স্বর্ণ আর শুধু অলংকারের কাঁচামাল নয়, অনিশ্চিত সময়ের আশ্রয়ও।

কেন এই আশ্রয় খোঁজা?
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের ২০২৬ সালের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জরিপ উত্তরটির একটি বড় অংশ খুলে দেয়। ৭৬টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অংশগ্রহণে করা জরিপে ৮৯ শতাংশ রিজার্ভ ব্যবস্থাপক মনে করেন, আগামী এক বছরে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ মজুত আরও বাড়বে। ৪৫ শতাংশ বলেছেন, তাঁদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানও স্বর্ণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। ৮০ শতাংশের বেশি উত্তরদাতার ধারণা, পাঁচ বছর পর বৈশ্বিক রিজার্ভে স্বর্ণের অংশ আজকের চেয়ে বেশি হবে। অন্যদিকে ৭৪ শতাংশ মনে করেন, বৈশ্বিক রিজার্ভে ডলারের অংশ কমবে।
সংখ্যাগুলোকে শুধু বাজারের উচ্ছ্বাস বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। গত চার বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বছরে গড়ে প্রায় এক হাজার টন স্বর্ণ সংগ্রহ করেছে। তার আগের দশকে গড় ছিল প্রায় পাঁচশ টন। ২০২৫ সালেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিট ৮৬৩ টন স্বর্ণ কিনেছে। আগের তিন বছরের হাজার টনের বেশি কেনাকাটার তুলনায় কম হলেও তা ২০১০ থেকে ২০২১ সালের বার্ষিক গড় ৪৭৩ টনের অনেক ওপরে।
স্বর্ণের দিকে এই যাত্রার পেছনে আছে এক নতুন ধরনের ভয়। যুদ্ধের ভয়। নিষেধাজ্ঞার ভয়। মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার ভয়। বৈদেশিক সম্পদ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে আটকে যাওয়ার ভয়। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার বৈদেশিক রিজার্ভের বড় অংশ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় অচল হয়ে যাওয়ার ঘটনা বহু দেশকে নতুন করে ভাবিয়েছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণও বলছে, সেই ঘটনার পর বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে ডলার নির্ভরতা কমিয়ে রিজার্ভ বৈচিত্র্য আনার প্রবণতা শক্ত হয়েছে।
ডলার একটি দেশের মুদ্রা। স্বর্ণ কোনো দেশের নয়।
এই সরল বাক্যটির ভেতর আজকের পরিবর্তনের গভীর অর্থ আছে। একটি ডলারের নোটের পেছনে আছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, তার কেন্দ্রীয় ব্যাংক, রাজনৈতিক শক্তি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি। একটি স্বর্ণের বারের পেছনে কোনো সরকারের স্বাক্ষর লাগে না। কোনো প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষ হলে তার মূল্য শেষ হয় না। কোনো নির্বাচন, কোনো জোট, কোনো সীমান্ত বদলালেও ধাতুটি একই থাকে। মানুষ তাকে মূল্যবান বলে মেনে এসেছে রাজাদের যুগে, সাম্রাজ্যের পতনের পরেও, কাগুজে মুদ্রার জন্মের পরেও।
এ কারণেই স্বর্ণের দাম শুধু বাজারের খবর নয়, কখনো কখনো পৃথিবীর উদ্বেগেরও ভাষা।
ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২০২৬ সালের জুনের প্রতিবেদনে একটি বিস্ময়কর তথ্য আছে। ২০২৫ সালের শেষে বাজারমূল্যে বিশ্বের মোট সরকারি রিজার্ভের প্রায় ২৭ শতাংশ ছিল স্বর্ণে। একই হিসাবে মার্কিন ট্রেজারি সিকিউরিটিজের অংশ ছিল ২২ শতাংশ এবং ইউরোর ১৫ শতাংশ। তবে এখানেই সতর্কতা জরুরি। স্বর্ণের এই অংশ বৃদ্ধির বড় কারণ ছিল মূল্যবৃদ্ধি। স্বর্ণের দাম স্থির ধরে হিসাব করলে ছবিটি অনেক কম নাটকীয় হয়। অর্থাৎ স্বর্ণের উত্থান বাস্তব, কিন্তু তাকে ডলারের পতনের ঘোষণা বানালে ভুল হবে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সর্বশেষ কফার তথ্যও সেই সতর্কতাই শেখায়। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিশ্বের সরকারি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ১৩ দশমিক ২২ ট্রিলিয়ন ডলার। এর ৫৬ দশমিক ৭০ শতাংশ এখনো মার্কিন ডলারে। প্রথম প্রান্তিকে ছিল ৫৭ দশমিক ১৮ শতাংশ। ডলারের অংশ সামান্য কমেছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ঋণ, পেমেন্ট এবং রিজার্ভে তার প্রাধান্য এখনো প্রশ্নাতীত।
তাহলে আসলে কী বদলাচ্ছে?
বদলাচ্ছে নির্ভরতার দর্শন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যেন বলছে, ডলার থাকবে, ইউরো থাকবে, অন্য মুদ্রাও থাকবে, কিন্তু সব ভরসা একটি দরজার পেছনে রাখা হবে না। রিজার্ভের ভল্টে আরেকটি দরজা খোলা থাকবে। আর সেই দরজার ওপাশে থাকবে স্বর্ণ।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের জরিপে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণ রাখার প্রধান কারণ হিসেবে বলেছে সংকটকালে এর কার্যকারিতা, দীর্ঘমেয়াদে সম্পদের মূল্য ধরে রাখার ক্ষমতা, বৈচিত্র্য আনার সুবিধা এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে পোল্যান্ড ৮২ টন, উজবেকিস্তান ৪১ টন, চীন ৪০ টন এবং কাজাখস্তান ২৭ টন স্বর্ণ যোগ করেছে। আবার তুরস্ক ও রাশিয়ার মতো কিছু দেশ বিক্রিও করেছে। অর্থাৎ এটি একমুখী উন্মাদনা নয়। প্রয়োজন, মূল্য, তারল্য এবং জাতীয় কৌশল অনুযায়ী দেশগুলো কিনছে, আবার কেউ বিক্রি করছে।
বাংলাদেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
আমাদের দেশে রিজার্ভের আলোচনা প্রায়ই একটি সংখ্যায় এসে থামে। কত বিলিয়ন ডলার আছে, গত সপ্তাহে কত কমেছে, নতুন ঋণে কত বাড়ল। কিন্তু রিজার্ভ শুধু অঙ্ক নয়, তার গঠনও গুরুত্বপূর্ণ। কোন সম্পদে কতটা রাখা হলো, কোনটি দ্রুত ব্যবহারযোগ্য, কোনটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা দেয়, কোনটির ঝুঁকি কোথায়, এসব প্রশ্নও সমান জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীতে ৩০ জুন স্বর্ণ ও রুপার মূল্য দেখানো হয়েছে প্রায় ১৩ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। এক বছর আগে যা ছিল প্রায় ১১ হাজার ৮৯ কোটি টাকা। একই বিবরণীতে স্বর্ণ লেনদেনসংক্রান্ত দাবির মূল্যও আগের বছরের তুলনায় বেশি। এই বৃদ্ধি যে শুধু নতুন স্বর্ণ কেনার ফল, এমন সিদ্ধান্ত টানা ঠিক হবে না। বাজারমূল্যের পরিবর্তনও হিসাবকে প্রভাবিত করে। কিন্তু তথ্যটি অন্তত মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশের রিজার্ভ ব্যবস্থাপনাতেও স্বর্ণ একটি বাস্তব সম্পদ, কেবল গয়নার দোকানের বিষয় নয়।
তবে স্বর্ণকে নিয়ে রোমান্টিক হওয়ারও সুযোগ নেই। স্বর্ণ সুদ দেয় না। ডলারের মতো আমদানি বিল মুহূর্তে মেটানো যায় না। ভৌত স্বর্ণ সংরক্ষণে খরচ আছে। দামও ওঠে নামে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই বলেছে, স্বর্ণের মূল্য অস্থির এবং এর সরবরাহ প্রয়োজনমতো বাড়ানো যায় না। ফলে বুদ্ধিমান রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার অর্থ ডলার বিক্রি করে সোনা কেনা নয়। অর্থ হলো নিরাপত্তা, তারল্য ও আয়, এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য রাখা।
একটি সাধারণ পরিবারও তো একই শিক্ষা জানে। মাসের সব টাকা কেউ নগদে রাখে না, আবার সবটুকু জমি কিনেও ফেলে না। কিছু থাকে হাতের কাছে, কিছু ব্যাংকে, কিছু দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ে। কারণ জীবনের বিপদ আগে থেকে দরজায় কড়া নাড়ে না। রাষ্ট্রের জীবনও আলাদা নয়। শুধু অঙ্কটি বড়, দায়িত্বটি অসীম।
এই জায়গাতেই স্বর্ণের গল্পটি মানবিক।
মায়ের আলমারির ছোট্ট বাক্সে রাখা একজোড়া চুড়ি আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্ধকার ভল্টে রাখা শত শত কিলোগ্রাম স্বর্ণের উদ্দেশ্য এক নয়। কিন্তু তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত মিল আছে। দুটির পেছনেই কাজ করে একটি প্রাচীন অনুভূতি, খারাপ দিন এলে যেন হাতে কিছু থাকে।
একসময় আমাদের মায়েরা বিপদের দিনের কথা ভেবে একটি বালা খুলে রাখতেন। সংসারে অসুখ এলে, সন্তানের পড়াশোনার খরচ এলে, হঠাৎ কোনো বিপদে পড়লে সেই স্বর্ণ বিক্রি হতো। অর্থনীতির কোনো বই তাঁরা হয়তো পড়েননি। কিন্তু ঝুঁকি ভাগ করে রাখার যে দর্শন আজ বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো অনুসরণ করছে, তার একটি সহজ মানবিক সংস্করণ বহুদিন ধরেই ছিল সেই ছোট্ট কাঠের বা লাল মখমলের গয়নার বাক্সে।
হয়তো এ কারণেই প্রযুক্তির এই যুগেও স্বর্ণ পুরোনো হয়ে যায়নি। আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বাজার বিশ্লেষণ করি, সেকেন্ডে কোটি কোটি ডলার স্থানান্তর করি, ডিজিটাল মুদ্রার ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলি। অথচ রাষ্ট্রের সবচেয়ে নিরাপদ ঘরের দরজা খুললে সেখানে এখনো পড়ে থাকে সেই ধাতব বার। নীরব, ভারী, সুদহীন। তবু বিশ্বাসযোগ্য।
আজ ডলার এখনো বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা। আগামীকালও হঠাৎ তার সিংহাসন খালি হয়ে যাবে না। কিন্তু রাজপ্রাসাদের ভেতরে জায়গা বদলাচ্ছে। একটি ঘরে একটু কম আলো, আরেকটি ঘরে একটু বেশি জায়গা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে নিঃশব্দে জমছে স্বর্ণ।
এই নীরবতাটিই হয়তো সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ।
কারণ ইতিহাস সবসময় কামানের শব্দে বদলায় না। কখনো কখনো ইতিহাস বদলায় ভল্টের বন্ধ দরজার আড়ালে, যখন একটি রাষ্ট্র তার ভবিষ্যতের ভয় মেপে আরেকটি স্বর্ণের বার তুলে রাখে।
লেখক: প্রধান সম্পাদক





