
আলী কদর পলাশ
কখনো কখনো একটি দেশের সময়কে বুঝতে সংসদের কার্যবিবরণী পড়তে হয় না। একটি বইয়ের দোকানের বন্ধ শাটার, একজন বিক্রয়কর্মীর ভয়ার্ত মুখ কিংবা আকাশে উড়তে থাকা বিমানের পর্দা থেকে হঠাৎ সরে যাওয়া একটি চলচ্চিত্রও অনেক কথা বলে।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ‘লালসালু’ লিখেছিলেন ভয় নিয়ে। মানুষের বিশ্বাসকে ব্যবহার করে কীভাবে ক্ষমতা জন্ম নেয়, কীভাবে একটি লাল কাপড়ের নিচে চাপা পড়ে প্রশ্ন, সংশয় ও মানুষের সহজ বুদ্ধি, সেই গল্প তিনি আমাদের শুনিয়েছিলেন বহু আগে। আশ্চর্য, এত বছর পরও মজিদের ছায়া যেন আমাদের পিছু ছাড়ে না। শুধু লাল কাপড়টি বদলায়। কখনো সেটি ক্ষমতা, কখনো দল, কখনো জনতার হুঙ্কার, কখনো আবার রাষ্ট্রের অস্বস্তিকর নীরবতা।

বাংলাবাজারে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের বিক্রয়কেন্দ্রে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রিকে কেন্দ্র করে যা ঘটেছে, তা সেই নীরবতারই এক অস্বস্তিকর ছবি। ইউপিএলের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকজন ব্যক্তি বইটিকে নিষিদ্ধ দাবি করে বিক্রি বন্ধ করতে বলেন, শাটার নামিয়ে দুই কর্মীকে হয়রানি করা হয় এবং পরে তাঁদের পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়া হয়। অথচ ইউপিএল বলছে, সরকার বা আদালতের মাধ্যমে বইটি নিষিদ্ধ হওয়ার কোনো তথ্য তাদের জানা নেই।
এখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রশ্ন নন। তাঁকে কে ভালোবাসেন, কে সমালোচনা করেন, সেটিও এই আলোচনার বিষয় নয়। প্রশ্ন আরও বড়। কোনো নাগরিক কি আরেক নাগরিকের হয়ে ঠিক করে দেবেন, তিনি কোন বই পড়বেন? কোনো গোষ্ঠীর ক্রোধ কি আদালতের রায়ের জায়গা নিতে পারে?
একটি সভ্য রাষ্ট্রের উত্তর হওয়া উচিত আইনের ভাষায়। কারণ বইয়ের বিচার পাঠক করবে, গবেষক করবে, ইতিহাস করবে। একটি বই ভুল হতে পারে, পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে, এমনকি প্রবলভাবে অপছন্দেরও হতে পারে। তার উত্তর আরেকটি বই। তার বিরুদ্ধে দলিল হাজির করা যায়। তর্ক করা যায়। কিন্তু বইয়ের দোকানের শাটার নামিয়ে দেওয়া যুক্তি নয়। সেটি যুক্তির পরাজয়।
আমাদের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয় এবং আইনসঙ্গত সীমার মধ্যে বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতাকেও স্বীকৃতি দেয়। তাই সরকারের দায়িত্ব শুধু নিজে বই নিষিদ্ধ না করা নয়। এমন পরিবেশ নিশ্চিত করাও তার দায়িত্ব, যেখানে আইনের বাইরে দাঁড়িয়ে অন্য কেউ নিষেধাজ্ঞার অভিনয় করতে না পারে।
এর মধ্যেই আরেকটি ঘটনা প্রশ্ন জাগিয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ইন ফ্লাইট বিনোদন তালিকা থেকে তানভীর মোকাম্মেলের ‘লালসালু’ ও ‘চিত্রা নদীর পারে’ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিমান কর্তৃপক্ষ অবশ্য স্পষ্ট করেছে, এটি কোনো নিষেধাজ্ঞা নয়। তাদের বক্তব্য, লাইসেন্স, সীমিত স্টোরেজ ও নিয়মিত কনটেন্ট পরিবর্তনের কারণে সাধারণত ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে চলচ্চিত্রের তালিকা বদলানো হয়। সংশ্লিষ্ট পরিবেশককেও বলা হয়েছে, ছবি দুটি দীর্ঘদিন প্রদর্শনের পর আপাতত সরানো হয়েছে এবং পরে আবার দেখানো হতে পারে।
এই ব্যাখ্যাকে উপেক্ষা করা ন্যায্য হবে না। তবু সময়েরও একটি ভাষা আছে। একই সময়ে একটি বই নিয়ে হট্টগোল, দোকানে শাটার, কর্মীর হয়রানি আর দুটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র ঘিরে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হলে মানুষের উদ্বেগকে নিছক কল্পনা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
‘চিত্রা নদীর পারে’ আসলে একটি নদীর গল্প নয়। দেশভাগের ধারালো ছুরিতে কেটে যাওয়া মানুষের গল্প। ঘর হারানোর গল্প। স্মৃতির গল্প। ‘লালসালু’ও শুধু একটি মাজারের গল্প নয়। সেটি ভয়কে ক্ষমতায় রূপান্তরের গল্প। আর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ও শুধু একজন রাজনীতিকের স্মৃতিকথা নয়। সেটি ইতিহাসের একটি পক্ষের সাক্ষ্য, যার সঙ্গে দ্বিমত করা যায়, বিতর্ক করা যায়, কিন্তু না পড়ে তাকে মুছে ফেলার চেষ্টা ইতিহাসচর্চা নয়।
মানবিক রাষ্ট্রের সৌন্দর্য এখানেই যে সে নিজের পছন্দের বইয়ের পাশাপাশি অপছন্দের বইটিরও নিরাপত্তা দেয়। নিজের প্রশংসার চলচ্চিত্রের পাশাপাশি অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলা শিল্পকেও জায়গা দেয়। যে রাষ্ট্র কেবল অনুগত শব্দ ভালোবাসে, সে ক্রমে আয়না সরিয়ে দেয়। অথচ আয়না সরালে মুখ বদলায় না, শুধু নিজের মুখটি দেখা বন্ধ হয়।
এ দেশের মানুষ বহু নিষেধের ইতিহাস দেখেছে। কখনো কবিতা সন্দেহভাজন হয়েছে, কখনো গান, কখনো সংবাদপত্র, কখনো বই। সরকার বদলেছে, পতাকা বদলায়নি। অথচ ক্ষমতার এক পুরোনো অসুখ বারবার ফিরে এসেছে। নিজের অপছন্দকে জনস্বার্থ মনে করা এবং অন্যের কণ্ঠকে বিপদ মনে করা।
বর্তমান রাষ্ট্রের পরীক্ষাও তাই এখানে। সরকার কী বলছে শুধু তা দিয়ে নয়, তার চোখের সামনে কী ঘটছে এবং ঘটার পর সে কী করছে, তা দিয়েও তাকে বিচার করবে ইতিহাস।
একটি বইয়ের দোকানের শাটার খুব সামান্য জিনিস। কয়েক ফুট টিন বা লোহা মাত্র। কিন্তু সেই শাটার যখন একটি বইয়ের সামনে নামে, শব্দটি অনেক দূর যায়।
সেই শব্দ শুনে কোনো লেখক হয়তো একটি বাক্য মুছে দেন। কোনো প্রকাশক পাণ্ডুলিপি ফেরত দেন। কোনো তরুণ পাঠক বইটি হাতে নিয়ে আবার রেখে দেন।
রাষ্ট্র তখন বলতে পারে, আমরা তো কিছু নিষিদ্ধ করিনি।
কিন্তু ভয় ততক্ষণে নিষেধাজ্ঞার কাজটি করে ফেলেছে।
লেখক: প্রধান সম্পাদক





