
দিনের ঢাকা আর রাতের ঢাকা যেন একই শহরের দুই মুখ। দিনের আলোয় যে সড়ক মানুষের ব্যস্ত পদচারণায় মুখর, রাত গভীর হলে সেই পথের কোথাও কোথাও নেমে আসে অন্য এক বাস্তবতা। যানজটে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির জানালা তখন শুধু কাচের জানালা থাকে না, হয়ে ওঠে ভয়ের পাতলা এক দেয়াল। বাইরে কে দাঁড়িয়ে আছে, কার হাতে রড, কার হাতে ছুরি, কে হঠাৎ দরজা টেনে খুলবে, সেই অনিশ্চয়তা নাগরিক জীবনের স্বাভাবিকতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে।
নয়া দিগন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দোলাইরপাড় থেকে পোস্তগোলা, মোহাম্মদপুর থেকে আদাবর, মিরপুর থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কিছু অপরাধের তালিকা নয়। এগুলো আমাদের নগরজীবনের ভেতরে জমে ওঠা নিরাপত্তাহীনতার লক্ষণ। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং, হামলা, ভাঙচুর কিংবা দখলের অভিযোগ যখন একই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় শোনা যায়, তখন সমস্যাটি আর কেবল একটি থানার বা একটি এলাকার থাকে না। এটি হয়ে ওঠে নগরের সামগ্রিক শৃঙ্খলার প্রশ্ন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, অপরাধ এখন মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসও বদলে দিচ্ছে। যানজটে আটকে পড়া চালক দরজা লক করছেন, ট্রাকচালক গ্লাস তুলে দিচ্ছেন, যাত্রীরা হাতে লাঠি নিয়ে পাহারা দিচ্ছেন। কোনো শহরের মানুষের যদি নিজের নিরাপত্তার জন্য নিজেকেই প্রহরী হতে হয়, তাহলে সেখানে রাষ্ট্রের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে, গ্রেফতারও হচ্ছে। কিন্তু একই মানুষ জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এখানেই সমস্যার গভীরতা। অপরাধীকে ধরে নিয়ে যাওয়া দৃশ্যমান কাজ, কিন্তু অপরাধের শেকড় খুঁজে বের করা অনেক কঠিন। কে অর্থ দেয়, কে আশ্রয় দেয়, কার প্রভাবে একটি দল বারবার সংগঠিত হয়, সেই নেপথ্য জগত অন্ধকারেই থেকে গেলে সামনের সারির কয়েকজনকে গ্রেফতার করে স্থায়ী সমাধান আসবে না।
মানবাধিকারকর্মী ও অপরাধ বিশ্লেষকেরা যে প্রশ্ন তুলেছেন, সেটিও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কোনো অপরাধীর পরিচয় রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক প্রভাবের আড়ালে ঢেকে গেলে আইন দুর্বল হয়। আইন দুর্বল হলে অপরাধীর সাহস বাড়ে। আর অপরাধীর সাহস বাড়লে সাধারণ মানুষের ভয়ই হয়ে ওঠে শহরের সবচেয়ে বড় সত্য।
আইজিপি দলীয় পরিচয় না দেখে অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার নির্দেশ দিয়েছেন। এ নির্দেশ গুরুত্বপূর্ণ। তবে নির্দেশের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হবে মাঠে তার বাস্তবায়নে। নাগরিক জানতে চায়, অপরাধের সময় পুলিশ কত দ্রুত পৌঁছায়, অভিযোগের তদন্ত কত দূর যায়, নেপথ্যের প্রভাবশালী ব্যক্তি সত্যিই আইনের মুখোমুখি হন কি না।
শহর শুধু উঁচু ভবন, উড়ালসড়ক আর আলো ঝলমলে বিপণিবিতানের নাম নয়। শহরের আসল পরিচয় নির্ধারিত হয় একজন সাধারণ মানুষ রাত বারোটায় কতটা নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরতে পারেন, একজন নারী কতটা নির্ভয়ে রাস্তা পার হতে পারেন, একজন ট্রাকচালক যানজটে দাঁড়িয়ে নিজের মালামাল ও জীবন নিয়ে কতটা নিরাপদ বোধ করেন তার ওপর।
রাতের অন্ধকার প্রকৃতির নিয়ম। কিন্তু সেই অন্ধকার যদি অপরাধীর আশ্রয় হয়ে ওঠে, তবে সেটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতার ছায়া। ঢাকার রাতকে আবার মানুষের করে তুলতে হলে শুধু টহল বাড়ালেই হবে না। অপরাধের পেছনের শক্তিকে দৃশ্যমান করতে হবে, তদন্ত ও বিচারকে কার্যকর করতে হবে এবং নাগরিককে ফিরিয়ে দিতে হবে সবচেয়ে মৌলিক অধিকারটি, নিরাপদে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা।





