
আলী কদর পলাশ
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্ক আজ শেষ হচ্ছে। নিউইয়র্কে গত এক সপ্তাহে বিশ্বনেতাদের ভাষণ, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, মধ্যস্থতা এবং পর্দার আড়ালের কূটনীতি কম হয়নি। কিন্তু এই ব্যস্ত কূটনৈতিক সপ্তাহের শেষে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর দিকে তাকালে চিত্রটি খুব একটা বদলায়নি। ইরান যুদ্ধের নিষ্পত্তি হয়নি, ইউক্রেনে যুদ্ধ চলছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা কাটেনি, সুদানের মানবিক বিপর্যয়ও থামেনি। রয়টার্সের ২৬ সেপ্টেম্বরের বিশ্লেষণও বলছে, বড় সংঘাতগুলোতে কোনো বড় ধরনের অগ্রগতি না হলেও ইরান ও ইউক্রেন নিয়ে আলোচনার পথ কিছুটা এগিয়েছে।
সবচেয়ে বেশি নজর ছিল ইরানকে ঘিরে। যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার মধ্যে নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ হয়েছে। তেহরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া, মার্কিন সামরিক চাপ কমানো এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ প্রত্যাহারের মতো বিষয় সামনে এনেছে। জাতিসংঘ অধিবেশনকে নতুন করে কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ হিসেবেই দেখেছিল ইরান।
কিন্তু নিউইয়র্কের আলোচনা শেষ হওয়ার আগেই সেই আশার সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাত দিনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, তেহরান আনুষ্ঠানিক মার্কিন জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে এবং সংকটের কূটনৈতিক সমাধান এখনও সম্ভব বলে মনে করে। অর্থাৎ আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, কিন্তু সমঝোতাও কাছাকাছি আসেনি।

ইউক্রেন যুদ্ধেও প্রায় একই ছবি। নিউইয়র্কে মার্কিন ও রুশ কর্মকর্তাদের আলোচনায় খাদ্যশস্য পরিবহন, কৃষ্ণসাগরের নৌপথ এবং জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা সীমিত করার মতো বিষয় সামনে এসেছে। এগুলো বাস্তবায়িত হলে সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তি তৈরি হতে পারে। তবে যুদ্ধের রাজনৈতিক নিষ্পত্তি কিংবা স্থায়ী যুদ্ধবিরতির কোনো স্পষ্ট পথ এখনও দেখা যায়নি। ফলে সীমিত সমঝোতার সম্ভাবনা এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তি এক জিনিস নয়, এবারের কূটনীতিতে সেই ব্যবধানই আবার সামনে এসেছে।
এবারের অধিবেশনের আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। যুদ্ধ ও নিরাপত্তার পাশাপাশি এআইয়ের ঝুঁকি, নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক কাঠামো নিয়ে জাতিসংঘে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হয়েছে। মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তাঁর সাধারণ পরিষদের ভাষণেও এআইয়ের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনা, যুদ্ধ বন্ধ, জলবায়ু সংকট এবং জাতিসংঘ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। অর্থাৎ প্রচলিত সামরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রযুক্তিও এখন বৈশ্বিক নিরাপত্তার আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
এই পরিবর্তনের মধ্যেই জলবায়ু প্রশ্নের গুরুত্ব যেন আড়ালে না পড়ে, সেটিও বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে বাংলাদেশের প্রয়োজন পর্যাপ্ত অর্থায়ন, অভিযোজন সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা যতই জরুরি হোক, পুরোনো অথচ গভীরতর জলবায়ু সংকটকে দ্বিতীয় সারিতে ঠেলে দেওয়ার সুযোগ নেই।
জাতিসংঘের নিজের সংকটও এবার আলোচনার বাইরে ছিল না। অর্থসংকট, বিভিন্ন সংস্থায় অর্থায়ন হ্রাস এবং বড় শক্তিগুলোর মতবিরোধ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তারপরও প্রায় ১৩০ জন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানকে একই সময়ে একই মঞ্চে আনার মতো বিকল্প বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান এখনও নেই। প্রকাশ্যে পরস্পরকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করা দেশগুলোর প্রতিনিধিরাও জাতিসংঘ অধিবেশনের পাশে যোগাযোগের সুযোগ পাচ্ছেন।
বাংলাদেশের কাছে এসব কোনো দূরের কূটনৈতিক ঘটনা নয়। হরমুজের সংকট জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয় বাড়াতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধ খাদ্য ও পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রভাব ফেলে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি, বাণিজ্য ও প্রবাসী স্বার্থও জড়িত। একই সঙ্গে জলবায়ু অর্থায়ন এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থাকে কার্যকর রাখার প্রশ্ন বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য সরাসরি জাতীয় স্বার্থের বিষয়।
সাধারণ বিতর্ক আজ শেষ হবে। কিন্তু যে সংকটগুলো নিয়ে বিশ্বনেতারা নিউইয়র্কে এসেছিলেন, সেগুলোর অধিকাংশই অমীমাংসিত থেকে যাচ্ছে। এবারের জাতিসংঘ সপ্তাহ তাই কোনো বড় শান্তিচুক্তির স্মৃতি রেখে যাচ্ছে না। বরং একটি বাস্তবতাই স্পষ্ট করছে: যুদ্ধ থামানোর ক্ষমতা সীমিত হলেও কথাবার্তার পথ খোলা রাখার প্রয়োজন ফুরায়নি। আর বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে সেই পথটুকুও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।





