বজলুর রশীদ MBE: মানবকল্যাণে প্রজ্বলিত এক প্রদীপশিখা

Date:

spot_img

প্রবাসে সাফল্য, স্বদেশে কর্মসংস্থান ও মানুষের পাশে থাকার এক অনন্য জীবন

আবু বকর সিদ্দিক শুভ

দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে বসবাস করা যায়। কিন্তু হৃদয় থেকে দেশকে দূরে রাখা যায় না। জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসা যদি সত্যিই গভীর হয়, তবে ভৌগোলিক দূরত্বও মানুষের দায়বদ্ধতাকে মুছে দিতে পারে না। ব্রিটিশ বাংলাদেশি ব্যবসায়ী, সমাজসেবক ও মানবহিতৈষী বজলুর রশীদ MBE সেই সত্যেরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

জীবনের বড় একটি সময় যুক্তরাজ্যে কাটিয়েছেন। সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন নিজের মেধা, শ্রম ও অধ্যবসায়ে। পেয়েছেন ব্রিটিশ রাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ MBE সম্মাননা। তবু সাফল্যের শিখরে দাঁড়িয়ে ভুলে যাননি নিজের শেকড়। তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে আজও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ, মৌলভীবাজার এবং এ দেশের সাধারণ মানুষ।

প্রবাসের স্বাচ্ছন্দ্য তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি। বরং নিজের অর্জন, অভিজ্ঞতা ও সামর্থ্যের একটি বড় অংশ তিনি কাজে লাগিয়েছেন বাংলাদেশের মানুষের জন্য। কর্মসংস্থান সৃষ্টি থেকে বীমা শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা থেকে শিল্প ও ব্যবসা, নানা ক্ষেত্রে তাঁর উদ্যোগের কেন্দ্রে থেকেছে মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার আকাঙ্ক্ষা।

ব্রিটিশ রাজপরিবারের স্বীকৃতি

মানবসেবা ও সামাজিক ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বজলুর রশীদকে দেওয়া হয়েছে MBE, Member of the Most Excellent Order of the British Empire সম্মাননা। ব্রিটিশ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ব্যবস্থায় এটি একটি মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি।

১৯১৭ সালে রাজা পঞ্চম জর্জ প্রতিষ্ঠা করেন Order of the British Empire। সমাজসেবা, শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, খেলাধুলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতিতে এই অর্ডারের সম্মাননা প্রদান করা হয়।

নামের শেষে ‘MBE’ ব্যবহারের অধিকার তাই বজলুর রশীদের দীর্ঘ কর্মজীবনের একটি বিশেষ স্বীকৃতি। একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের এমন অর্জন তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের গৌরবের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাফল্যেরও স্মারক।

কিন্তু বজলুর রশীদের জীবনের গল্প শুধু একটি সম্মাননার গল্প নয়। তাঁর জীবনের বড় পরিচয় পাওয়া যায় সেই সম্মাননার পরেও তিনি কী করেছেন, সেই প্রশ্নের উত্তরে।

প্রবাসে প্রতিষ্ঠা, হৃদয়ে বাংলাদেশ

২৮ মে জন্ম নেওয়া বজলুর রশীদ উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে সত্তরের দশকের শেষদিকে যুক্তরাজ্যে যান। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ এবং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করেই সেখানে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যবসায় প্রবেশ করেন এবং রেস্তোরাঁ ব্যবসায় প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।

পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ বাংলাদেশি ক্যাটারিং শিল্পের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। ২০০৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্যাটারার্স অ্যাসোসিয়েশন ইউকের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সংগঠক ও ব্যবসায়ী হিসেবে এই দীর্ঘ পথচলায় ব্রিটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়।

সাফল্য তাঁকে দিয়েছে স্বাচ্ছন্দ্য। দিয়েছে সামাজিক মর্যাদা। কিন্তু তাঁর জীবনের পথ সেখানেই থেমে থাকেনি।

একসময় তিনি ফিরে তাকিয়েছেন সেই দেশের দিকে, যে দেশে তাঁর জন্ম। যে মাটিতে তাঁর শেকড়।

মানুষের হাতে কাজ তুলে দেওয়ার স্বপ্ন

বজলুর রশীদের কাছে মানুষের কল্যাণ শুধু অনুদান দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি।

একজন মানুষকে সাময়িক সহায়তা করার চেয়ে তাঁর হাতে কাজ তুলে দেওয়া অনেক বেশি স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে। এই বিশ্বাস থেকেই বাংলাদেশে বিভিন্ন ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছেন তিনি।

এই উদ্যোগগুলোর অন্যতম প্রগ্রেসিভ লাইফ ইনসুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি বীমা খাতকে শুধু ব্যবসার ক্ষেত্র হিসেবে দেখেননি, কর্মসংস্থান ও মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা তৈরির একটি মাধ্যম হিসেবেও দেখেছেন।

প্রগ্রেসিভ লাইফের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান যুক্ত হয়েছে বলে তাঁর দেওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যখন এত মানুষের জীবিকা যুক্ত হয়, তখন তার সাফল্যের অর্থ কেবল ব্যালান্সশিটের প্রবৃদ্ধি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে যায় হাজার হাজার পরিবার, তাদের সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটিকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে তিনি বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে গৃহীত উদ্যোগগুলো বীমা অঙ্গনেও আলোচিত হয়েছে।

বিনিয়োগের কেন্দ্রে মানুষ

বীমা শিল্পেই তাঁর উদ্যোগ সীমাবদ্ধ থাকেনি। স্বাস্থ্যসেবা ও বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে কাজ করছেন বজলুর রশীদ।

তাঁর চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে একটি সহজ উপলব্ধি। বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন কাজের সুযোগ। একজন তরুণের কর্মসংস্থান মানে শুধু একজন মানুষের আয় নয়, একটি পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা।

এই জায়গাতেই একজন ব্যবসায়ী বজলুর রশীদের সঙ্গে একজন সমাজসেবক বজলুর রশীদের পরিচয় মিলে যায়।

ব্যবসা তাঁর কাছে কেবল মুনাফার হিসাব নয়। ব্যবসার মধ্য দিয়েও মানুষের পাশে দাঁড়ানো যায়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়, সমাজের পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর জীবনমান পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করা যায়, নিজের কর্মজীবনে সেই বিশ্বাসেরই বাস্তব প্রয়োগ ঘটানোর চেষ্টা করেছেন তিনি।

যে টান বারবার দেশে ফেরায়

জীবনের একটি পর্যায়ে এসে অনেকেই কাজের চাপ কমিয়ে দেন। পরিবারকে সময় দেন। দীর্ঘ কর্মজীবনের অর্জন নিয়ে শান্ত জীবন বেছে নেন।

বজলুর রশীদের পথটি কিছুটা ভিন্ন।

লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত জীবন, পরিবার ও নাগরিক সুবিধা থাকার পরও তিনি বারবার বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন। বয়স তাঁর কাজের আগ্রহ কমাতে পারেনি। বরং দেশের মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ তাঁকে আরও বেশি সক্রিয় রেখেছে।

এই ফিরে আসার মধ্যে শুধু ব্যবসায়িক হিসাব নেই। রয়েছে জন্মভূমির প্রতি এক ধরনের ঋণ স্বীকারের অনুভূতি।

তিনি বিশ্বাস করেন, প্রবাসে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও সামর্থ্য যদি নিজের দেশের মানুষের কাজে না লাগে, তবে সেই অর্জনের পূর্ণতা আসে না।

তাই কখনো বীমা শিল্পে, কখনো স্বাস্থ্যসেবায়, কখনো শিল্প ও কর্মসংস্থানের নতুন উদ্যোগে তাঁর উপস্থিতি দেখা যায়।

সম্মানের চেয়েও বড় মানুষের ভালোবাসা

MBE তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত একটি মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি। কিন্তু মানুষের জীবনে কিছু অর্জন থাকে, যা কোনো পদক কিংবা উপাধির চেয়েও বড়।

কোনো তরুণ যখন একটি চাকরি পেয়ে পরিবারের দায়িত্ব নেয়, কোনো পরিবার যখন আর্থিক নিরাপত্তার আশ্বাস পায়, কিংবা কোনো উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন মানুষের জীবিকার পথ তৈরি হয়, তখন সেই অর্জনের হিসাব পদক দিয়ে করা যায় না।

বজলুর রশীদের কর্মজীবনের সবচেয়ে মানবিক দিকটি সম্ভবত এখানেই।

তিনি তাঁর সাফল্যকে শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। প্রবাসে অর্জিত অভিজ্ঞতা, যোগাযোগ, অর্থ ও শ্রমের একটি অংশ নিজের দেশের মানুষের জন্য কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন।

নতুন প্রজন্মের সামনে একটি বার্তা

বজলুর রশীদ MBE-এর দীর্ঘ জীবন ও কর্মের মধ্যে তরুণ প্রজন্মের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রয়েছে।

সফল হওয়ার অর্থ শুধু নিজের অবস্থান পরিবর্তন করা নয়। প্রকৃত সাফল্য তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন সেই সাফল্যের আলো অন্য মানুষের জীবনেও পৌঁছায়।

একজন মানুষ পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন না কেন, তাঁর শেকড়ের জন্য কাজ করার সুযোগ থাকে। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা, দায়িত্ববোধ এবং কাজ করার সাহস।

সাত সমুদ্র তেরো নদীর দূরত্ব তাই বজলুর রশীদের কাছে কখনো বাংলাদেশকে দূরের দেশ করে দিতে পারেনি।

মৌলভীবাজারের সন্তান থেকে ব্রিটিশ বাংলাদেশি সফল ব্যবসায়ী, কমিউনিটি নেতা থেকে MBE সম্মাননা, এরপর আবার বাংলাদেশের মাটিতে কর্মসংস্থান ও মানবকল্যাণে নিজেকে সম্পৃক্ত করা, তাঁর জীবন যেন এক দীর্ঘ বৃত্ত সম্পূর্ণ করার গল্প।

এই গল্পের কেন্দ্রে অর্থ কিংবা পদমর্যাদা নয়।

কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ।

আর মানুষের জন্য জ্বলে থাকা এমন প্রদীপের আলো কখনো শুধু একজন মানুষের চারপাশ আলোকিত করে না। তার আলো ছড়িয়ে পড়ে সমাজে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

বজলুর রশীদ MBE সেই আলোরই এক প্রজ্জ্বলিত শিখা।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

বাচসাসের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে ভোট ২০ নভেম্বর

এম.আর.জে শান্ত: বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির (বাচসাস) ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের...

কমিশনার মামুনের পিতার মৃত্যুতে দোয়া মাহফিল

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর ও বংশাল থানা...

আগামী তিন বছরে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে: ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার

বাগেরহাট প্রতিনিধি আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশে এক লাখ নতুন...

খুলনায় ফুটপাত দখলমুক্ত করতে কেসিসির অভিযান, ভাঙা হলো অবৈধ দোকানপাট

খুলনা প্রতিনিধি খুলনা নগরীর ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ...