জীবনবীমার টাকা কোথায়

Date:

spot_img

নিজস্ব প্রতিবেদক: জীবনবীমা এমন এক আর্থিক চুক্তি যেখানে মানুষ বছরের পর বছর টাকা জমা দেন, এই আশা নিয়ে—একদিন বিপদে পরিবারের পাশে দাঁড়াবে সেই সঞ্চয়। কিন্তু বাংলাদেশে জীবনবীমা খাতের বাস্তবতা অনেক গ্রাহকের কাছে উল্টো। প্রিমিয়াম সময়মতো জমা হলেও দাবি পরিশোধে দেরি। বকেয়া জমে হাজার কোটি টাকা। তহবিল ব্যবস্থাপনায় অস্বচ্ছতা, পরিচালনা ও শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা এবং অনিয়মের অভিযোগ—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে বড় আস্থা সংকট।

সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক ঘটনায় শীর্ষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা, রিমান্ড, অর্থনৈতিক গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধান ও নিয়ন্ত্রকের বিশেষ নিরীক্ষা উদ্যোগ সামনে এনেছে একটি প্রশ্ন—গ্রাহকের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার টাকা, অর্থাৎ জীবন তহবিল, কতটা সুরক্ষিত?

কেস–১: ন্যাশনাল লাইফ—৪০০ কোটি টাকার জমি কেনায় অনিয়ম অভিযোগ

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৫ সালের ৪ মে বেঙ্গল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান মোর্শেদ আলম, তাঁর ছেলে এবং ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করে। অভিযোগ—কোম্পানির নামে জমি কেনার লেনদেনে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার অনিয়ম, এর মধ্যে প্রায় ২৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। মামলাটি দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় দায়ের হয়।
এ ধরনের বড় স্থাবর সম্পত্তি কেনা যদি স্বার্থসংঘাত, অতিমূল্য নির্ধারণ বা অর্থ সরানোর অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়, তার সরাসরি ধাক্কা পড়ে জীবন তহবিলে। কারণ জীবন তহবিলই গ্রাহকের ভবিষ্যৎ দাবি পরিশোধের মূল ভাণ্ডার। তহবিল থেকে অর্থ বেরিয়ে গেলে বা অপচয় হলে দাবি নিষ্পত্তির সক্ষমতা কমে যায়।

কিশোরগঞ্জের এক পলিসিধারী রফিকুল ইসলাম (ছদ্মনাম) বললেন,
“১৮ বছর ধরে টাকা দিলাম। মেয়ের বিয়ের জন্য মেয়াদপূর্তির টাকা দরকার।”
অফিসে গেলে জবাব—“প্রক্রিয়া চলছে।”
তিনি বলেন, “তাহলে কোটি কোটি টাকা গেল কোথায়?”

কেস–২: ফারইস্ট ইসলামী লাইফ—২০৭ কোটি টাকার অনিয়ম মামলা, দাবি নিষ্পত্তি মাত্র ১.৯৬%

২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর ঢাকার আদালত ফারইস্ট ইসলামী লাইফের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলামকে কোম্পানির নামে জমি ও ভবন ক্রয়-বিক্রয়ে ২০৭ কোটি টাকার অনিয়মের মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠায়।

এই কোম্পানির ক্ষেত্রে দাবি নিষ্পত্তির চিত্র আরও ভয়াবহ। ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়—ফারইস্ট ইসলামী লাইফের মোট দাবি ছিল ২,৯৭৬ কোটি টাকা, কিন্তু নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৫৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা। অর্থাৎ দাবি নিষ্পত্তির হার মাত্র ১.৯৬%।

সংকট মোকাবিলায় কোম্পানিটি গাড়ি বিক্রি ও কর্মী ছাঁটাইয়ের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে—যা প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক চাপের মাত্রা স্পষ্ট করে।

নরসিংদীর এক গৃহবধূ সালমা খাতুন (ছদ্মনাম) বললেন,
“স্বামী মারা গেছে। মৃত্যুদাবি জমা দিলাম।”
এক বছর, দুই বছর—কাগজই ঘোরে।
তিনি বলেন, “আমার স্বামীর টাকাও কি সেই অনিয়মে হারিয়ে গেছে?”

কেস–৩: সোনালী লাইফ—৩৫৩ কোটি টাকার অস্বাভাবিকতা, অর্থপাচারের অভিযোগ

বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (BFIU) সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে ৩৫৩ কোটি টাকার অস্বাভাবিকতা পেয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রে সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস ও তাঁর পরিবারের নাম এসেছে। অভিযোগ—অনিয়ম, প্রতারণা ও অর্থপাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা।

যদিও এ ঘটনায় দাবি নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট হারের সঠিক তথ্য নেই, তবে তহবিলের ভেতরে এত বড় অস্বাভাবিকতা মানেই গ্রাহকের সঞ্চয়ের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ।

চট্টগ্রামের এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নাসির উদ্দিন (ছদ্মনাম) বলেন,
“১২ বছর টাকা দিয়েছি। মেয়াদপূর্তির টাকা দিয়ে চিকিৎসা করাব।”
এখন শোনেন—“৩৫৩ কোটি টাকার অস্বাভাবিকতা।”
তিনি বলেন, “তাহলে আমার টাকা কোথায়?”

কেস–৪: ১৫ কোম্পানির বিশেষ নিরীক্ষা—বকেয়া দাবি ৪,৬১৫ কোটি

এ সংকট শুধু কেয়েকটি কোম্পানি বা কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা নয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ ২০২২–২০২৪ সময়কালে ১৫টি জীবনবীমা কোম্পানির ওপর বিশেষ নিরীক্ষা শুরু করেছে—কারণ দাবি নিষ্পত্তির ঘাটতি অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে এবং সম্ভাব্য অনিয়ম খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

২০২৪ সালের শেষে এসব কোম্পানির বকেয়া দাবি ৪,৬১৫ কোটি টাকা, আর তারা পরিশোধ করেছে মাত্র ৬৩৫ কোটি টাকা।

বরিশালের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হারুন অর রশিদ (ছদ্মনাম) বলেন,
“তিনবার গেছি। বলে—‘নতুন তালিকা হবে।’”
তিনি বলেন, “দাবি কি কোনোদিনই শেষ হবে না?”
আরেকটি প্রশ্ন তার—“আমরা তো সবচেয়ে দুর্বল পক্ষ।”

সংকটের দুই স্তর: অনিয়ম বনাম দাবি নিষ্পত্তির ব্যর্থতা

চারটি ঘটনাকে পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়—জীবনবীমা সংকটের দুটি স্তর রয়েছে।
এক স্তরে শীর্ষ পর্যায়ের অনিয়মের অভিযোগ—মামলা, রিমান্ড, অর্থপাচার অনুসন্ধান।
আরেক স্তরে দাবি নিষ্পত্তির দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতা—যেখানে হাজার কোটি টাকা বকেয়া পড়ে থাকে।

এই দুই স্তর একত্র হলে বড় প্রশ্ন দাঁড়ায়—জীবন তহবিল কি সত্যিই গ্রাহকের নিরাপত্তা দিচ্ছে, নাকি দুর্বল শাসনব্যবস্থা ও অনিয়মের ঝুঁকিতে সেটি ক্ষয়ে যাচ্ছে?

শেষ কথা: আস্থা ফেরাতে অডিট যথেষ্ট নয়, কাঠামোগত পদক্ষেপ জরুরি

জীবনবীমা খাতে আস্থা ফেরাতে শুধু নির্দেশনা বা নোটিশ যথেষ্ট নয়।
দাবি নিষ্পত্তির হারকে বাধ্যতামূলক শৃঙ্খলার ভেতরে আনতে হবে। জীবন তহবিল কোথায় বিনিয়োগ হচ্ছে, কীভাবে ব্যয় হচ্ছে—তা নিয়মিতভাবে প্রকাশ্য ও যাচাইযোগ্য করতে হবে।

যেসব ঘটনায় মামলা ও অনুসন্ধান চলছে সেখানে দ্রুত বিচারিক অগ্রগতি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। আর যেসব কোম্পানি ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ, তাদের ক্ষেত্রে বাজার সংশোধনী ব্যবস্থা—ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন, একীভূতকরণ বা অবসান—বাস্তবায়ন করতে হবে।

কারণ জীবনবীমা যদি দাবি দিতে না পারে, তবে সেটি আর নিরাপত্তা নয়; সেটি সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতির ওপর দাঁড়ানো এক অনিশ্চয়তা।

ফ্যাক্ট বক্স

ন্যাশনাল লাইফ: ৪০০ কোটি অনিয়ম অভিযোগ, মামলা (৪ মে ২০২৫)

ফারইস্ট ইসলামী লাইফ: ২০৭ কোটি অনিয়ম মামলা; দাবি নিষ্পত্তি ১.৯৬% (৫৮.৩০ কোটি/২,৯৭৬ কোটি)

সোনালী লাইফ: ৩৫৩ কোটি টাকার অস্বাভাবিকতা, BFIU অনুসন্ধান

১৫ কোম্পানি বিশেষ নিরীক্ষা: বকেয়া দাবি ৪,৬১৫ কোটি; পরিশোধ ৬৩৫ কোটি (২০২৪ শেষে)

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

বাচসাসের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে ভোট ২০ নভেম্বর

এম.আর.জে শান্ত: বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির (বাচসাস) ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের...

কমিশনার মামুনের পিতার মৃত্যুতে দোয়া মাহফিল

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর ও বংশাল থানা...

আগামী তিন বছরে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে: ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার

বাগেরহাট প্রতিনিধি আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশে এক লাখ নতুন...

খুলনায় ফুটপাত দখলমুক্ত করতে কেসিসির অভিযান, ভাঙা হলো অবৈধ দোকানপাট

খুলনা প্রতিনিধি খুলনা নগরীর ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ...